CV Download                                                 Tel. +88029291013 | Cell Phone +8801713015485 | Email mnoor@ce.buet.ac.bd

(প্রিয়.কম) ড. মুনাজ আহমেদ নূর ১১ এপ্রিল ২০১৩ সাল থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসির দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষা ব্যবস্থার আমুল পরিবর্তনের জন্য নিজেকে ঢেলে দিয়েছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনে। এবং কারণও আছে বটে।

 

শিক্ষাগত জীবনে তিনি ২০০০ সালে ইউনিভার্সিটি অব টোকিও থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের উপর পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেছেন। তার মূল গবেষণা বিষয়বস্তু ছিলো কনক্রিট টেকনোলজি, আরবান সেফটি, ক্লাইমেট চেঞ্জ, আর্থকোয়াক ডিজাস্টার। ২০০৫ সালে তিনি নেদারল্যান্ডসে একটি সংক্ষিপ্ত প্রাইভেট পাবলিক পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। ২০০৭ সালে ভূমিকম্পতত্ব (সাইজমলজি) এর উপর একটি সংক্ষিপ্ত কোর্সে অংশগ্রহণ করেন। ২০০৮ সালে ইটালিতে ভূমিকম্প বিষয়ক একটি ট্রেনিং প্রোগ্রামেও অংশ নিয়েছেন ড. মুনাজ। কিন্তু তার এই সকল যোগ্যতাকে ছাড়িয়ে গেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে তার অবদান এবং কর্মকান্ড। দিন-রাত নিরলস পরিশ্রম করে এই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে নিয়ে গেছেন নতুন মাত্রায়। প্রতিদিন কাজ করছেন ২০ লক্ষাধিক ছাত্রছাত্রীর জীবন গড়তে। বাংলাদেশের আর কোনও বিশ্ববিদ্যালয় এতো মানুষের জীবন গড়ার দায়িত্ব নেয়নি।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠানটির কথা আসলে প্রথমেই আসে সেশন জটের প্রসঙ্গ। বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব নেয়ার পর সেশনজট নিরসন ও শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়নে নিয়েছে বিভিন্ন পদক্ষেপ। এরমধ্যে রয়েছে প্রযুক্তি ব্যবহার করে ছাত্র-ছাত্রী ও আওতাধীন কলেজগুলোকে পরিচালনা। এই ২০ লক্ষাধিক ছাত্রছাত্রী এবং ৬০ হাজারের বেশি শিক্ষককে সঠিকভাবে সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনায় আনতে প্রয়োগ করা হয়েছে তথ্য-প্রযুক্তির।

প্রিয়.কমের কাছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহউপাচার্য মুনাজ আহমেদ নূর তাদের বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরেন। তিনি বলেন ‘এরই মধ্যে আমরা ঘোষণা দিয়েছি ২০১৮ সাল থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় হবে সম্পূর্ণ সেশনজটমুক্ত। এজন্য ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রামের’ আওতায় ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত সব পরীক্ষা নেওয়া ও ফলাফল প্রকাশের সময়ও ঘোষণা করা হয়েছে - যা আমরা তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় প্রতিনিয়ত দেখভাল করছি।’

প্রিয়. কমের সঙ্গে আলাপচারিতার চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:

মুনাজ আহমেদ নূর বলেন, বাংলাদেশের অনেকের কাছেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে ভালো ধারনা রাখে না। আমাদের এখন কলেজের সংখ্যা ২ হাজার ১শ ৫৪ এর বেশি। পাশাপাশি কলেজের সংখ্যা বাড়ছে। সরকারি-বেসরকারি সকল কলেজই আমাদের অধীনে। আমরা তিনটি বিষয়ে ডিগ্রি দিতে পারিনি; তা হলো- প্রকৌশল, মেডিসিন আর কৃষি। এছাড়া আমরা সব ডিগ্রি রেখেছি। ডিগ্রির মধ্যে জেনারেল সাবজেক্ট হচ্ছে ৩২টি, প্রফেশন সাবজেক্টে ১৭টি।

একান্ত আলাপকালে মুনাজ আহমেদ নূর ও প্রিয়.কম-এর সম্পাদক জাকারিয়া স্বপন

বর্তমান ছাত্র সংখ্যা ২০ লক্ষেরও বেশি। বাংলাদেশের ‘তৃতীয় পর্যায়ের শিক্ষা’র ৭০ ভাগ আমরা নিযন্ত্রন করি। প্রতি বছর এইচএসসিতে ১১ লক্ষ ছাত্র বের হয়। আমরা অনার্সে এবার ভর্তি করেছি ২ লক্ষ ৬০ হাজারের বেশি ছাত্রছাত্রী, আর পাস-কোর্সে ৩ লক্ষের ওপরে। মানুষ এগুলোকে বিবেচনায় নেয় না। বাংলাদেশের অন্যান্য সব বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মিলে এক লক্ষ সামলাতে পারে না; আর আমরা সাড়ে ৫ লক্ষের ওপর সামলিয়ে নিচ্ছি। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান এক মিলিমিটার বাড়ানো গেলেই বাংলাদেশ ২ মিলিমিটার ওপরে উঠে যাবে।

এ বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর চাপ সামাল দিতে নিজেদের অতিরিক্ত শ্রমের বিষয়টিও সামনে আনেন। প্রিয়.কম-কে তিনি বলেন, ‘আপনারা আসাতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। কারণ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্কে সবাই শুধু নেগেটিভ কথা বলতে চায়। গত দুই বছরে আমরা আমাদের মাননীয় ভাইস চ্যাঞ্জলরের নেতৃত্বে যে কাজগুলো করেছি তা ধাপে ধাপে বহুদূর এগিয়ে নিয়েছি। এজন্য আমরা প্রায়ই রাত ১১টা পর্যন্ত কাজ করি। অনেক সময় তা ১৮ ঘন্টাও পেরিয়ে যায়।’

বহুল আলোচিত সেশন জট প্রসঙ্গে: সর্বোচ্চ সেশন জট আছে ১ বছর ৪ মাস। অথচ বলা হয় ৪ বছরের অনার্স করতে লাগে ছয় থেকে সাত বছর। এটা অপপ্রচার। যাতে ছাত্র না আসে সেই জন্য সেশন জটকেই ফোকাস করা হয়। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশন জট থাকলে তা নিয়ে কেউ নিউজ করে না। দেখুন, বুয়েটের যারা ০৯ ব্যাচ তারা এখনো বের হতে পারে নাই, এমনকি পরিক্ষা দিতে পারে নাই। অথচ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা পরিক্ষা দিয়েছে।

শিক্ষার মানোন্নয়ন প্রসঙ্গে: শিক্ষকদের মান বাড়ানোর সম্পর্কে তিনি বলেন, আমাদের ২১৫৪টি কলেজ। এর মধ্যে সরকারি ২৭৫টি বেসরকারি ১ হাজার ৮৭৯টি। আমাদের একটাই মেন্ডেড হচ্ছে টিচার্স ট্রেনিং। আমরা বছরে ১১টা টিচার্স ব্যাচ করাই এবং প্রতিটি ব্যাচে ৩টি করে ৩৩টি সাবজেক্ট থাকে। শিক্ষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে লাইভ ব্রটকাষ্টিংয়ের এর পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। এর ফলে সারা দেশব্যাপী বিস্তৃত অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষকগণকে অতি সহজে এবং স্বল্প খরচে একযোগে প্রশিক্ষণের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, আমাদের বলা হয় পৃথিবীর ৫ম বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু বর্তমান ডাটা অনুযায়ী আমরা পৃথিবীর ৩য় বৃহৎ এফিলিয়েটেড বিশ্ববিদ্যালয়। কারণ ওই সময় এটি করা হয়েছিল আমাদের ১৫ লক্ষ ছাত্র দিয়ে; কিন্তু বর্তমানে আমাদের ২০ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রী। আমাদের শিক্ষক সংখ্যা ৬০ হাজার। আমাদের কাছাকাছি আছে দিল্লি, তাদের ৪০ লক্ষ; তুরস্কের ৩০ লক্ষের মত।

তিনি বলেন, সারাদেশে আমাদের কলেজে ভরা। শুধুমাত্র পাহাড় ও সুন্দরবন বাদ দিলেই দেশের আর সকল স্থানেই আমাদের কলেজ রয়েছে। বাংলাদেশের মধ্যম শ্রেণির মানুষের শিক্ষার চাহিদা পূরণ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। মান প্রসঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দেন, ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ফরেন সার্ভিস ও ক্যাডার সার্ভিসে সর্বোচ্চ।’

ছাত্র ছাত্রীদের আসন সংখ্যা: মুনাজ আহমেদ নূর বলেন আমাদের ছেলে-মেয়ের হার হচ্ছে ৫৫ শতাংশ ও ৪৫ শতাংশ। যা কোথাও বা কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। সর্বোচ্চ সংখ্যক মেয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। শুধুমাত্র মহিলা কলেজ আছে ৭০টি।

তিনি আরো বলেন, ধরুন যখন একটা মেয়ের বিয়ে হয় তখন সে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। তখন তার স্বামী ছেলেদের কলেজে তাকে পড়তে দিতে চায় না। তখন আমরা তাকে মহিলা কলেজে ট্রান্সফার করে দিই। সে যখন আসে তখনই আমরা তা দিয়ে দিই। অনেক সময়ই নারীরা তা চালিয়ে যেতে পারেন না। এমন উদাহরনও আছে যে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাম্বুলেন্সেও পরিক্ষা নিয়েছে।

প্রাযুক্তিক উন্নয়ন: বিগত দুই বছরের মধ্যে আমরা আমাদের ওয়েব সাইট আপগ্রেড করেছি। কারিগরি মান উন্নয়নের মাধ্যমে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইট তৈরি করা হয়েছে। সাইটটি রেসপনসিভ করা হয়েছে যাতে সকল ডিভাইস যেমন-মোবাইল বা ট্যাব থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা ব্রাউজ করতে পারে।

সাইটে ক্যাটাগরীভিত্তিক তথ্য খুঁজা, প্রয়োজনীয় সকল ফরম ডাউনলোড সুবিধা প্রদান, পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হচ্ছে।

কারিকুলাম ডেভেলপমেন্ট এর আওতায় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসুচির আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ৩ বছর মেয়াদী ডিগ্রী পাস কোর্স, ৪ বছর মেয়াদী অনার্স কোর্স (৩৩টি ডিসিপ্লিনে), মাস্টার্স প্রিলিমিনারী ও মাস্টার্স ফাইনাল এর ক্রেডিট আওয়ার ভিত্তিক গ্রেডিং পদ্ধতির নতুন সিলেবাস প্রণয়ন/পরিমার্জন ইতোমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্নাঙ্গ ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনার লক্ষ্যে স্ক্রীপ্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করা হয়েছে। এতে বছরে প্রায় ২ কোটি উত্তরপত্র মূল্যায়ণে ওএমআর পদ্ধতির পরিবর্তে ফরম ছাপানোসহ এগুলো সর্টিং, স্ক্যানিং ও সলভিং করতে যে সময় ক্ষেপন হয় তা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য এবং ওএমআর সংক্রান্ত দূর্ণীতি সহ খাতা জালিয়াতি রোধকল্পে এই নতুন স্ক্রীপ্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করা হয়েছে বলেও জানান সহ-উপাচার্য।

ব্যাচেলর (অনার্স ডিগ্রী) রেগুলেশন সংশোধন: কারিকুলাম ডেভেলপমেন্ট এর লক্ষ্যে অভিন্ন গ্রেডিং সিস্টেমের আওতায় ক্রেডিট আওয়ার ভিত্তিক জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাচেলর অনার্স ডিগ্রীর রেগুলেশন সংশোধন করে তা পুস্তিকাকারে প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

কারিকুলাম ডেভেলপমেন্ট: স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস বাধ্যতামূলক পাঠ্য হিসেবে অন্তর্ভূক্তকরণ এবং সিলেবাস প্রণয়নঃ সকল শিক্ষার্থীদের জন্য ‘স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস’ শিরোনামে ১০০ নম্বরের একটি কোর্স ২০১৩-২০১৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

অন-লাইনে সকল কোর্সের ভর্তি কার্যক্রম: স্নাতক (সম্মান), স্নাতক (পাস), মাস্টার্স ১ম ও শেষ পর্বসহ সকল প্রফেশনাল কোর্সের ভর্তি কার্যক্রম বর্তমানে অন-লাইনে সম্পন্ন করা হচ্ছে। প্রথম বারের মত ছবিসহ সকল শিক্ষার্থীর তথ্য ইতোমধ্যে অন-লাইনে সংগ্রহ করা হয়েছে। ভর্তি সংক্রান্ত ওয়েবসাইট করা হয়েছে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সকল পরীক্ষার প্রবেশপত্র ও রেজিস্ট্রেশন কার্ড ডিজিটাল স্বাক্ষরসহ ওয়েব সাইটে প্রকাশ করা হচ্ছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সর্ব প্রথম এ ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হল। এ ব্যবস্থার ফলে শিক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র সংগ্রহের ভোগান্তি আর হবে না। দূর-দূরান্তের কলেজ কর্তৃপক্ষকেও আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গাজীপুর ক্যাম্পাসে এসে প্রবেশপত্র সংগ্রহ করতে হবে না। এর ফলে সময় ও অর্থের অপচয় রোধ হবে। এ পদক্ষেপ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ডিজিটাল কর্মসূচি বাস্তবায়নের অংশবিশেষ।

ক্যাম্পাস নেটওয়ার্ক (ফাইবার অপটিক বেইজড্): বিশ্ববিদ্যালয়ের গাজীপুর ক্যাম্পাসের সকল ভবনের সাথে সংযোগ সাধন করে শক্তিশালী ফাইবার অপটিক বেইজড্ নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হয়েছে। এই নেটওয়ার্কে দ্রুত গতি সম্পন্ন ইন্টারনেট সংযোগ (৩৮+১০ এমবিপিএস) দেয়া হয়েছে। বর্তমানে ২০০টি কম্পিউটার এর আওতায় আনা হয়েছে। তবে এর সংযোগ ক্ষমতা রয়েছে ৭৭০টি কম্পিউটারের। নেটওয়ার্ক নিরাপত্তার জন্য ২টি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন সিসকো ফায়ারওয়াল স্থাপন করা হয়েছে।

প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ: দেশের ছয়টি বিভাগীয় শহরে (সিলেট, রংপুর, বরিশাল, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা) আঞ্চলিক কেন্দ্র নির্মানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এজন্য একজন করে প্রশাসনিক ও একাডেমিক উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন পরিচালক নিয়োগ, সিকিউরিটি ডিভাইস স্থাপন ও স্ট্রং রুম তৈরীর কাজ চলছে। আঞ্চলিক কেন্দ্রসমূহে নিজস্ব ভৌত অবকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু ও ডিপিপি তৈরী প্রায় সমাপ্তির পথে রয়েছে।

পরিক্ষা পদ্ধতি: ড.মুনাজ আহমেদ নূর জানান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বৈত পরীক্ষক পদ্ধতি বর্তমানে বাতিল করা হয়েছে। ভাইস-চ্যান্সেলর মহোদয়ের নেতৃত্বে মনিটরিং ব্যবস্থা, উত্তরপত্র বিতরণ, গ্রহণ ও নম্বর জমাদানে নতুন নিয়ম, ভর্তি ও রেজিস্ট্রেশন নতুন সেল চালু করা, নতুন টেকনিক্যাল জনবল প্রদান, জিপিও এর উপর নির্ভরশীলতা কমানো এবং ৩ মাসের মধ্যে ফলাফল প্রকাশে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

নতুন নতুন কোর্স: চলতি বছর থেকে ৫টি বিষয়ে থিসিসসহ দেড় বছর মেয়াদী মাস্টার্স ও এমবিএ প্রোগ্রাম চালু করা হয়েছে। বিষয়গুরো হলো বাংলা, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, কম্পিউটার সায়েন্স, এমবিএ। এই অন-ক্যাম্পাস মাস্টার্স প্রোগ্রাম পরিচালনা এবং শিক্ষার্থীদের আবাসনের জন্য নতুন একটি ডরমিটরী ভবন নির্মাণের জন্য এবারের বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

সেনালী সেবা কার্যক্রম: সারাদেশ থেকে শিক্ষকদের কলেজ থেকে ডিডি/পে-অর্ডার জমাদানের জন্য গাজীপুরে আসতে হয় না। তাদের জন্য চালু করা হয়েছে ‘সোনালী সেবা’, যার মাধ্যমে শিক্ষকদের বিল, সম্মানী, পরীক্ষার পারিতোষিক, ভ্রমন ভাতা ইত্যাদি তাদের ব্যাংক একাউন্টে সোনালী ব্যাংকের সোনালী সেবার মাধ্যমে সরাসরি পরিশোধ করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

শিক্ষক/ছাত্রছাত্রীদের ডাটাবেজ: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ছাত্রছাত্রীদের ডাটাবেস তৈরী করা হয়েছে। অধিভূক্ত সকল প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের ছবিযুক্ত প্রোফাইল তৈরী করা, প্রত্যেকের সাথে সহজ ও দ্রুত যোগাযোগের জন্য মোবাইল নম্বর ও ই-মেইল সংগ্রহ করা, সোনালী সেবার মাধ্যমে পরীক্ষক বিল প্রদানের জন্য একাউন্ট নম্বর সংগ্রহ করা, ইতোমধ্যে প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষক রেজিস্ট্রেশন কার্য সম্পাদন করেছেন। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সার্চ করার সুবিধা প্রদান, জিওলোকেশন ভিত্তিক শিক্ষক সার্চ করার সুবিধা প্রদান, অভিজ্ঞ শিক্ষক সার্চ করার সুবিধা প্রদান, পরীক্ষক নিয়োগে সচ্ছতা ও জবাদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই মূলত এত আয়োজন।

তিনি জানান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সকল কলেজ ও প্রতিষ্ঠানের ভৌগোলিক অবস্থান চিহ্নিত করে একটি জিআইএস (জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সিষ্টেম) ম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। ম্যাপটির মাধ্যমে একটি কলেজ থেকে অপর একটি নির্দিষ্ট দুরত্বের আওতাধীন সকল কলেজের অবস্থান ও সংখ্যা জানার ব্যবস্থাও রয়েছে এই সাইটটিতে।

ই-টেন্ডার: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রয় প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বিধান, দর প্রস্তাবকারীদের ভোগান্তিনিরসন ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কাগজপত্রের আধিক্য কমিয়ে এনে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আধুনিক ও ডিজিটাল পদ্ধতিতে দ্রুত প্রকিউরমেন্ট সম্পন্ন করার লক্ষ্যে ই-টেন্ডার চালু করা হয়েছে বলে জানান সহউপাচার্য।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল কার্যক্রম তথ্য প্রযুক্তির সফল প্রয়োগের মাধ্যমে প্রশাসনকে আরো স্বচ্ছ, জবাবদিহি ও গতিশীল করার ইতোমধ্যে ওরাকল বেইজড্ ইন্ট্রিগ্রেটেড সফটওয়্যার চালু করা হয়েছে। এতে প্রায় ২৬ টি মডিউল রয়েছে।

লাইভ ব্রডকাস্ট: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম লাইভ ব্রডকাস্টিং এর পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। এর ফলে সারা দেশব্যাপী অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষকদের একযোগে প্রশিক্ষণের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে। এই সিস্টেমে ডাটা আর্কাইভিং এর ব্যবস্থা থাকবে যাতে করে পুরাতন প্রশিক্ষণ প্রয়োজন অনুযায়ী দেখা সম্ভব হয়।

উচ্চ শিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে একাডেমিক ভবনের ১৩ তলায় ইতোমধ্যে ভিডিও কনফারেন্স /র্ভাচুয়াল ক্লাশরুম স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া বিটিআরসি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি নিজস্ব শর্ট কোড নেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে মোবাইলের মাধ্যমে এসএমএস করে পরীক্ষার ফলাফলসহ বিভিন্ন তথ্য জানা যাবে বলেও জানান তিনি।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২১ লক্ষ শিক্ষার্থী, ৫০ হাজার শিক্ষক, ২১৫৫টি কলেজের বিভিন্ন ভর্তি সংক্রান্ত, পরীক্ষা সংক্রান্ত, ফলাফল সংক্রান্তসহ যে কোন জিজ্ঞাসার জবাব টেলিফোনে দিতে একটি ইন-বাউন্ড কল-সেন্টার স্থাপনের কাজ চলছে বলেও জানান তিনি। এছাড়া রেজিঃ কার্ড সংশোধন, প্রবেশ পত্র সংশোধন, সার্টিফিকেট ও নম্বরপত্র উত্তলণসহ বিভিন্ন সেবা দ্রুত ও যথার্থ সময়ে প্রদানের জন্য আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির সমন্বয়ে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করণ করার কাজ চলমান বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

নিরাপত্তা: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে IP Based Video surveillance system স্থাপন করার কাজ চলছে। এর অংশ হিসেবে ইতিমধ্যেই আইসিটি দপ্তরে একটি Access Control Systemসহ ১৫টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হবে বলেও জানান তিনি। আর এসব কিছু তিনি তার মেয়াদে শেষ করে যাবেন বলেও নিজস্ব পরিকল্পনার কথা অকপটে বলেন প্রিয়.কমকে।

আর্কাইভ: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৯২ হতে ২০০০ সাল পর্যন্ত পরীক্ষার সকল টেবুলেশন বই স্ক্যান করে ডাটাবেস তৈরীসহ প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার তৈরীর কাজ চলছে। এতে তথ্য-উপাত্ত ম্যানুয়াল ভেরিফিকেশন, ট্রান্সক্রিপ্ট ইস্যু, প্রত্যয়নপত্র প্রদানসহ গুরুত্বপূর্ণ কাজ দ্রুত ও নির্ভূল হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল তথ্য সংরক্ষণে ডাটা সেন্টার নির্মানের বিষয়েও জানান তিনি। এছাড়া ডিজাস্টার রিকোভারি সেন্টার (ডিআরসি)’র পরিকল্পনাও তুলে ধরেন বলেন, আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি নির্ভর একটি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য একটি আধুনিক আইসিটি ভবন নির্মানেরও পরিকল্পনা রয়েছে। এজন্য একটি মাস্টার প্ল্যানও তৈরি করা হয়েছে। ফলে আগামী বিশ্ববিদ্যালয় পাবে আগামী ৫০ বছরের একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। আর এসব কিছু আমি আমার মেয়াদেই করে যেতে পারবো বলে বিশ্বাস করি।

প্রশ্নপত্র ছাপানোর ক্ষেত্রে বি.জি প্রেসের উপর নির্ভরশীলতা কমানো, দ্রুত প্রশ্নপত্র সরবরাহ এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে ক্লাউড প্রিন্টিং সিস্টেম চালু করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রতিটি কেন্দ্র থেকে প্রতিটি পরীক্ষার পত্র প্রতিদিন ছাপানো সম্ভব হবে বলে মনে করেন এই শিক্ষাবিদ।

ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়ে রুপান্তরে তিনি তার পরিকল্পনা সম্পর্কে বলেন, আমরা মোবাইল অ্যাপ ডেভেলোপ করার চেস্টা করছি। এই মোবাইলের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল নোটিশ, নিউজ, পরীক্ষার সময়সূচী, ফলাফল সহ বিভিন্ন তথ্য প্রদানের লক্ষ্যে এই উদ্যোগ হাতে নেয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীরা/অভিভাবকেরা যাতে করে তাদের প্রয়োজনীয় ফি মোবাইলের মাধ্যমে প্রদান করতে পারেন তার জন্যও এই অ্যাপস্ ব্যবহার করা যাবে। এছাড়া পরিকল্পনায় রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি অনলাইন রেডিও।

উল্লেখ্য, বিশ্ববিদ্যালয়টির এই ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে মাত্র দুই বছরে। বাংলাদেশের সবচে বড় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়ার মান এবং ব্যবস্থাপনা যত উন্নত করা যাবে, সাধারন মানুষের কাছে শিক্ষা তত সহজলভ্য হবে। আমরা আশা করি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়নের যে রোডম্যাপে এগিয়ে যাচ্ছে, তা অব্যাহত থাকবে।

Link